বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে যে কেউ এক টুকরো সবুজ মখমল দেখতে পান। আমাদের এই দেশটা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক উদ্যান। পাহাড়ের সবুজ ঢেউ, বনের গভীর নীরবতা, নদীর অনন্ত স্রোত, আর সমুদ্রের অসীম বিস্তার—সব মিলিয়ে এ দেশ যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। এখানে পাহাড়ের বুক চিরে ঝরনা নামে, এখানে বনের গহীনে বাঘের গর্জন শোনা যায়, আর এখানে হাওরের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আকাশের সাথে মিতালি করে। কিন্তু আজ এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের কপালে চিন্তার ভাঁজ। আমরা কি আসলেই জানি, আমরা কী হারিয়েছি এবং কী হারাতে চলেছি?
বাবা-কাকাদের সেই ধূসর ছবি বনাম আমাদের রঙিন ধ্বংসস্তূপ
আজ থেকে বিশ-ত্রিশ বছর আগের কথা ভাবুন। আমাদের বাবা কিংবা বড় কাকা যখন তাদের তরুণ বয়সে সিলেটের লাউয়াছড়া কিংবা সাতছড়ির গহীন অরণ্যে যেতেন, তখন ক্যামেরা ছিল না বললেই চলে। তাদের কাছে হয়তো কয়েকটা সাদা-কালো ঝাপসা ছবি আছে। কিন্তু সেই ছবিগুলোর পেছনে যে গল্প আছে, তা আজ রূপকথা মনে হয়।
তারা বলতেন, বনের ভেতর ঢুকলে দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে কান পাতা দায় ছিল। সূর্যের আলো গাছের পাতায় বাধা পেয়ে মাটিতে পৌঁছাতে পারতো না। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তাকালে গভীর বনের অন্ধকারে ভয় লাগতো। আর আজ? আমরা ঝকঝকে ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে যাই, রঙিন সব ড্রোন শট নেই, কিন্তু সেই ‘গভীরতা’ কি খুঁজে পাই? লাউয়াছড়া এখন বিভক্ত এক টুকরো বাগান মাত্র। সাতছড়ির নির্জনতা এখন পর্যটকদের উচ্চকিত হাসাহাসি আর জিপের হর্নে ফিকে হয়ে গেছে।
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া সেই প্রাণস্পন্দন
আমরা মাধবকুন্ডে যাই ঝরনা দেখতে, কিন্তু সেখানে গিয়ে আমরা কি সেই আগের সজীবতা পাই? মাধবপুর লেকের নীল পদ্মগুলো এখন প্লাস্টিকের বোতলের নিচে চাপা পড়ে ধুঁকছে। বিরিশিরির নীল জলরাশি এখন পর্যটকদের অবহেলার ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ হলো বন্যপ্রাণীদের জীবন। আগে এসব বনে চশমাপরা হনুমান কিংবা উল্টোলেজি বানর দেখতে কোনো কসরত করতে হতো না। তারা আপন মনে ফল খেয়ে বেড়াত। এখন সেই ফলদ গাছগুলো কোথায়? বনবিভাগের ব্যবসায়িক প্ল্যান্টেশনের (ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি) চাপে হারিয়ে গেছে দেশি আম, জাম, কাঁঠাল আর ডুমুরের বন। ফলত, বন্যপ্রাণীরা এখন বনের ফল ছেড়ে পর্যটকদের ফেলে দেওয়া বিস্কুট আর পটেটো চিপসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি কি এক ভয়াবহ বিবর্তন নয়?
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী অবশিষ্ট রইলো?
আমরা এখন বনের অর্ধেক সৌন্দর্য দেখতে পারছি না। আর আমাদের এই পর্যটন সংস্কৃতি যদি এভাবেই চলতে থাকে—যেখানে আমরা শুধু নিতে জানি, দিতে জানি না—তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কী দেখবে?
তারা হয়তো গহীন অরণ্যের কথা পড়বে পাঠ্যবইয়ে, কিন্তু বাস্তবে দেখবে কেবল কিছু রোপণ করা সারিবদ্ধ গাছ। তারা বাঘের গর্জনের গল্প শুনবে, কিন্তু বনের ভেতরে বানর বা হরিণের দেখাও পাবে না। জাফলং কিংবা সাদা পাথরের সেই শীতল জলপ্রবাহ তাদের কাছে হবে স্রেফ কিছু পাথুরে মরুভূমি।
প্রকৃতির নীরব হাহাকার
লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, মাধবপুর কিংবা বান্দরবানের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি আজ আর্তনাদ করছে। তারা পর্যটকদের ‘ভিজিটর’ হিসেবে নয়, ‘বন্ধু’ হিসেবে চায়। প্রকৃতি চায় আপনি যখন সেখানে যাবেন, তখন আপনার পায়ের ছাপ যেন ধ্বংসের চিহ্ন না রেখে বরং সৃষ্টির বীজ বুনে আসে।
আমরা যা হারিয়েছি তা হয়তো পুরোপুরি ফিরে পাবো না, কিন্তু আজ যদি আমরা একমুঠো বীজ নিয়ে বনের পাশে না দাঁড়াই, তবে যা অবশিষ্ট আছে তা-ও চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের এই ‘হারানো স্বর্গ’ পুনরুদ্ধারের একমাত্র চাবিকাঠি এখন আমাদের হাতে, আমাদের একমুঠো বীজের ভেতর।
প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি এই হারানো স্বর্গকে ফিরে পেতে চাই?
নাকি এটিকে শুধু স্মৃতির পাতায় রেখে দিতে চাই?
উত্তরটি আমাদের হাতেই।